Logo copy

ময়ূরকণ্ঠী কৃষি ডেস্ক :

পদ্ধতিটা খুব একটা কঠিন কিংবা ব্যয়সাধ্য নয়। বিষমুক্ত সবজি চাষ করতে কৃষি বিভাগের বিষমুক্ত থেরাপির পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা ব্যবহার করছেন তাদের নিজস্ব পদ্ধতি। আর এতেই বাজিমাত। কৃষকের কীটনাশক ক্রয় করার টাকা যেমন বেঁচে যাচ্ছে, তেমনি ভোক্তারাও পাচ্ছেন বিষমুক্ত সবজি। প্রথম দিকে কীটনাশকের অপপ্রয়োগ সম্পর্কে উত্তরের কৃষক এতটা সচেতন না হলেও এখন এর ক্ষতিকারক দিক জেনে গেছেন তাঁরা। এ কারণে তাঁরা বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে আগ্রহী। বাজারে বিষমুক্ত সবজির দাম বেশি, চাহিদাও বেশি। আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকরা বিষমুক্ত সবজি চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছেন। গ্রামগঞ্জে গেলে দিগন্তজোড়া মাঠের সবজি ক্ষেতে দেখা যায় এ আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার। মাঠপর্যায়ের কৃষকরাও জানান, এ পদ্ধতি ব্যবহার করে তাঁরা বেশি ফলন পাচ্ছেন।

সাধারণত পোকা দমনে কৃষক সবজি ক্ষেতে ইচ্ছামতো বিষ প্রয়োগ করেন। আর সেই বিষ খেয়ে পোকা মারা পড়ছে। এভাবে ক্ষেতের পোকা দমন হয়। এরপর বাজারে সেসব সবজি যায়। ব্যাপকভাবে বিক্রিও হয়। মানুষ সেসব বিষযুক্ত সবজি কিনে খায় কিন্তু মারা যাচ্ছে না। অথচ বিষ খেয়ে পোকা মরছে-প্রশ্নটি অন্য মানুষের মতো শিক্ষিত কৃষক মামুনের মনেও বার বার দোলা দেয়। কিন্তু তিনি উত্তর মেলাতে পারেন না। তখন মামুন অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে রকমারি সবজিও ফলান। তার সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে মামুন যান স্থানীয় কৃষি অফিসে। সেটা ২০০৫ সালের কথা। তখন সেখান থেকে তাঁকে জানানো হয় কীটনাশক প্রয়োগের কুফল সম্পর্কে। এরপর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীন তিনি বগুড়ার শেরপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় বিষমুক্ত পদ্ধতিতে সবজি চাষের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। সেই থেকেই শুরু। মামুন ও তাঁর কৃষি পরিবার বিষমুক্ত পদ্ধতিতে সবজি চাষে নামে। এখনো তা সফলভাবে অব্যাহত রেখেছেন। এবারও এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে ৪৩ শতক জমিতে বেগুন, এক বিঘা করে হাইব্রিড জাতের লাউ ও করলা এবং ২৬ শতক জমিতে মরিচ লাগিয়েছেন। বর্তমানে তাঁর দেখাদেখি শেরপুর ও ধুনট উপজেলার বেশ কয়েকটি এলাকায় অনেক কৃষক পরিবারই বিষমুক্ত পদ্ধতিতে সবজি চাষ করছে। মামুন জানান, বসতভিটা ছাড়া তাঁদের প্রায় ২৪ বিঘা জমি রয়েছে। পুরো জমিতেই বাবা ধান ফলাতেন। এ আয়েই তাঁদের সংসার ও লেখাপড়া চলত। সেই ২০০১ সালের কথা। বাবা আর পারছিলেন না। ধান বিক্রির টাকায় সংসার চালিয়ে লেখাপড়ার খরচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এ অবস্থায় আমরা তিন ভাই বাবার পাশে দাঁড়িয়ে যাই। নেমে পড়ি সবজি চাষে। এর পর থেকে তাঁদের আর পিছু তাকাতে হয়নি। ২০০৫ সাল থেকে তাঁরা বিষমুক্ত পদ্ধতি ব্যবহার করে রকমারি সবজি চাষ করে আসছেন। তিনি বলেন, কয়েক মাস আগে বিঘাখানেক জমিতে হাইব্রিড জাতের করলা লাগিয়েছিলেন। ফলন হয়েছে প্রায় ৮০ মণ। বিক্রি করেছেন ৫০ হাজার টাকার মতো। ব্যয় হয়েছিল মাত্র ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা।

বিষমুক্ত পদ্ধতিতে সবজি চাষ সম্পর্কে মামুন জানান, প্রথমে বিষমুক্ত পদ্ধতি সেক্স ফেরোমন সম্পর্কে উপজেলা কৃষি সম্প্র্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিই। এরপর ইস্পাহানি বায়োটেক কম্পানির মাধ্যমে আবারও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বেগুন ক্ষেতে সারিবদ্ধভাবে দুটি চিকন খুঁটি ব্যবহার করে একটি প্লাস্টিকের কৌটা বসানো হয়েছে। কৌটার এক পাশে একটি ছিদ্রও রাখা হয়েছে। এর নিচের অংশে পানি আর ওপরে সেক্স ফেরোমন ঝুলিয়ে রাখা। আর ওই পানিতে সামান্য হুইলের গুঁড়ো মিশিয়ে দেওয়া আছে। কৌটায় রাখা সেক্স ফেরোমন থেকে স্ত্রী পোকার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগ মুহূর্তের বিশেষ গন্ধ নির্গত হচ্ছে। এতে পুরুষ পোকা কৌটার সেই ছিদ্র দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে আর কৌটায় রাখা পানিতে ডুবে মরছে। এভাবে পাতা জাদুর বাক্সে পোকা পড়ছে আর মরছে। একই সঙ্গে বিষ প্রয়োগ ছাড়াই ক্ষেতের ফসল তরতর করে বাড়ছে। প্রযুক্তি সম্পর্কে মামুন জানান, প্রতি বিঘায় মাত্র ১৫টির মতো সেক্স ফেরোমন টোপ বা জাদুর বাক্স প্রয়োজন হবে। মাত্র ৩৫ টাকায় একটি প্লাস্টিক কৌটা আর ২৫ টাকার সেক্স ফেরোমন হলেই একেকটি টোপ তৈরি হয়ে যায়। এতে সবজি ক্ষেতে বিষ প্রয়োগের কোনো প্রয়োজন হয় না। ফলে বিষমুক্ত সবজিও পাওয়া যাবে, কৃষকের উৎপাদন খরচও কম হবে। এ পদ্ধতি প্রয়োগে সবজি চাষ করলে উৎপাদন ব্যয় কমে প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

শেরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আশরাফ আলী জানান, আধুনিক ও স্বল্প ব্যয়ের এ পদ্ধতি ব্যবহার করলে কৃষকের সবজি বিষমুক্ত থাকে। স্বাদে ও গন্ধেও সবজি থাকে স্বাভাবিক। অথচ কীটনাশক ব্যবহারে সবজি বিষযুক্ত হয়ে পড়ে। আর এসব সবজি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। তিনি বিষমুক্ত পদ্ধতিতে সবজি চাষে কৃষকের আগ্রহ দিনদিন বাড়ছে বলে জানান। আর এ কারণেই বিষমুক্ত পদ্ধতিতে এ উপজেলার কৃষকদের সবজিসহ অন্য ফসল চাষের ব্যাপারে নানাভাবে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

কৃষকের নিজস্ব পদ্ধতি ধুনটের মথুরাপুর ইউনিয়নের আলোয়া গ্রামের আদর্শ কৃষক কায়কোবাদ হোসেন জানান, কৃষি বিভাগের বিষমুক্ত থেরাপি ছাড়াও তাঁরা নিজস্ব কিছু থেরাপি ব্যবহার করেন। এর একটি নেট মশারি দেওয়া। এটা ব্যয়সাধ্য একটি পদ্ধতি হলেও শতভাগ নিরাপদ। এক বিঘা জমিতে মোট ৩০ হাজার টাকার নেট প্রয়োজন হয়। এটা ব্যবহার করা যায় তিনবার। ক্ষেতে মশারি টানানোর মতো করে এটা টানিয়ে দিলে পোকামাকড় আক্রমণ করতে পারে না। সঠিক নিয়মে চাষ করলে এ পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রতি বিঘায় দেড় লাখ টাকার সবজি পাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া অন্য পদ্ধতির মধ্যে তারা ব্যবহার করেন-এক বিঘা জমি সবজি চাষের জন্য যখন উপযোগী করা হয়, তখন মাটিতে দুই কেজি নেপথালিন গুঁড়া, আড়াই কেজি তুঁতে, ১৫ কেজি চুন দিতে হয়। এতে মাটি বিষমুক্ত হয়। সেই মাটিতে সবজি লাগালে গাছও বিষমুক্ত হয়ে বেড়ে ওঠে। কীট আক্রমণের পরিমাণ ৮০ থেকে ৯০ ভাগ কমে যায়। এক বিঘা জমিতে এ পদ্ধতি ব্যবহার করলে খরচ পড়ে দুই হাজার টাকা। তবে জমিতে একটু শ্রম বেশি দিতে হয়।
লেখক: লিমন বাসার, বগুড়া

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*