উদ্দেশিত জীবন
আমি জীবন।
আমার কোন জাত ছিলেনা।
জন্মেছিলাম মানুষ হিসাবে।
আমার মা আমাকে ধারন করেছিলেন
একটি মানব সন্তান প্রসব করবেন বলে।
ঠিক তা-ই হয়েছিল।

আমার বাবা সেওতো মানুষ।
মা-বাবার সম্পর্ক কতই না মধুর-
বুঝেছি অনেক পরে। শুনেছি-
আমার জন্মের সময় আমার উদ্দেশ্যে দেয়া হয়েছিল
আজান ধ্বনি ঃ আল্লাহু আকবার- আল্লাহ আকবার ….।
তখন পৃথিবী ছিল আনন্দ মুখর।
বিশেষতঃ আমাদের পৃথিবী আমার জন্য পরিবারের
শুক্রবার। পবিত্র দিনের একদিন। আতুর ঘর থেকে
পাড়াময় আশপাশের ক’গ্রাম ছুটে এসেছিল-
আমাকে দেখতে। মেয়েরাই ছিল বেশী, মাষী বলতেন।

তখন মা’র কষ্ট আর কষ্ট রইলনা।

দ্যাখ বু’ – তোর হিরের টুকরো কততো জ্ব-জ্বলে।
দুনিয়া দেখে। সব শিশুই দেখে। পোয়াতি খুশী হয়।

হ্যাঁ, সেই তো আমার প্রথম জগৎ দেখা।
আলো দেখা।
শব্দ শুনা।
কি যে আনন্দ। যেন উৎসব আমাকে ঘিরে।
সব্বাই ছুতে চায়। আর্শীবাদ করে। কোলে নেবার চেষ্টা
করে কেউ কেউ।

না আমি টাকা চিনতাম না। উপহার তা-ও না।
চাঁদবরন মুখ দেখে হাতে গুঁজবার ভান করেছিল অনেকেই।
ব্যর্থ হয়ে বিছানার চাদরের নীচে রেখে গেছে।
হায়রে মানব সন্তান।
এ খুশী ৪০ দিনভর চলতে থাকে।
মাঝে শুক্র থেকে প্রথম শুক্রবার ঝড়–নাপিত বেটার

পোয়াবার। এক ক্ষুর চালিয়ে চাল-ডাল নগদ- নারায়ন। আর এক দফা হৈ-চৈ নাম করন দিয়ে।
এমন আনুষ্ঠানিকতার ভেতর জীবন বদলাতে থাকে।
হাটি হাটি পা- পা….।

মনে পড়েছে নিপেন সারের কথা। যে স্যার
পয়ষট্টির যুদ্ধের পর কলিকাতা গিয়ে আর ফেরেনি।
কথায় কথায় বলতেন, মানুষ হও, মানুষের মত
মানুষ হও।
বাস্তবিক এসবে বিশ্বাস করা না করা আমার
রোধে ছিল না।
শিশু শিক্ষায় ছিল তোাত পাখি।
মা’ যা বলতেন আমি বলতাম।
মা’ যা শুনতেন- আমি শুনতাম মাত্র।
এভাবেই শিশু পাঠ।
দুষ্টামীতে। অসুখে-বিসুখে। আদরে স্নেহে। শাসনে
গৃহশিক্ষক বুদ্ধদেবের নয়- এ নব গ্রহ। দশ এ দিক।
এভাবেই একদিন দশ দিকের সন্ধান পেলাম।
এযে কত অজানারে জানতে শেখা …….।

আমার ভেতরের মানুষ কিশোর হতে থাকলো।
আমি চিনলাম অগ্রজ। চিনলাম বোন-দিদি যা-ই বলিনা
কেন। আত্মীয়-স্বজন। প্রতিবেশী। বাঙ্গালী
অবাঙ্গালী। ইংরেজ। হিন্দু-মুসলামন। বুদ্ধ-খৃষ্টান।
আরব-অনারব। কত্তো কি। এই নিয়ে বেড়ে ওঠা।
আমার গ্রামে নদী ছিল। ছোট নদী।
আমের মস্ত বাগান। তেঁতুল তলা।
ডানপিটে সময়ের স্কুল চুরি। বিলের ধারে মাছ ধরা। নদীতে
সাঁতরে ফেরা। একবার ডুবে ডুবে জল খেয়েছিলাম বেশ। বিকালে ট্রেন ছেড়ে গেলে দুপুরটা শেষ হতো।
তারপর সন্ধ্যো। তারই মাঝে গোল্লা ছুট। হা-ডুডু। কানামাছি-ভো-ভো। ডাংগুলি। মারবেল নিত্য দিনের রুটিন।

মার শাসন ছিল কড়া।
সন্ধ্যার বাতি মাড়িয়ে ঘরে ফিরলে বকা ঝকা।
বেতের মার। হজম হয়ে যেত সবই।
পরদিন যথা নিয়েমে-
যা করছি তাই
তখনো ওই একই কথা,
পড়া-লিখা কর। মানুষ হ-।
পড়া লেখা করে যে
গাড়ী ঘোড়া চড়ে সে’ ইত্যাদি। ইত্যাদি কথার
প্যান প্যানানি চলতো খানিক।
তবে কি আমি মানুষ নই? কবে মানুষ হবো?

জীবনের ভাবনা ছিল এমনটি।
জীবন জীবনের অন্য।
জীবন মানুষের জন্য।
জীবন কিশোর।
জীবন তরুন।
জীবন প্রেমিক।
জীবন একদিন বড় হয়ে যাবে এভাবেই।
মানুষ হবে।

জীবন কিশোর প্রেমের এক নায়ক।
মন্দিরা এলো প্রথম প্রেম হয়ে।
কে এই মন্দিরা?
মন্দিরা লাবন্যময়ী এক কিশোরী।
প্রজাপতির পাখা মেলে জীবনের হৃদয় শাখে জুড়ে বসলো।
মন্দিরা বেজে উঠলো জীবনের উচ্ছল প্রানে।
সকাল সন্ধার সঙ্গিনী মন্দিরা।

জীবনের কাছে মন্দিরা এক মধুর সংযোগ।
যার বিস্তার অলখেই ঘটে গ্যাছে।
কিংবা মন্দিরা নিজেই জানেনা জীবন কি করে-
এলো জীবনে।

মন্দিরা : ভালবাসা কোথায় থাকে ?
জীবন : স্বর্গে
মন্দিরা : স্বর্গ কোথায় ?
জীবন : (বুকে হাত দিয়ে) এই খানে
মন্দিরা : (মুচকি হেসে) জ্বি না বাবু সুখেনদের পুকুর ঘাটে
(দু’জনে হেসে)
মন্দিরা : জীবন,
জীবন : বলো
মন্দিরা : সমাজের দৃষ্টি আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায় কেন?
জীবন : দু’মেরু যে এক হয়েছে, তাইতো আমাদের প্রেমের স্বর্গ সুখেনদের পুকুর ঘাট। তোমার চোখ যেন এই পুকুর জলের তরঙ্গ, ভাসতে ভাসতে আমার চোখে স্নান করো। কি দারুন চেয়ে থাকা।
মন্দিরা : (মুচকি হেসে) হু… দুষ্ট কোথাকার, বুঝি না বুঝি ।
জীবন : মন্দিরা, তুমি এত কাছে তবু মনে হয় দূর কত দূর। তুমি ডাকছো। আমি মেলাতে পারিনা। অবাক হয়ে খুঁজি তোমার ভ্রুর কাটা দাগ। ঠোঁটের স্মিত হাসি। ঘন কালো চূলের বেনী দোলানো লাল ফিতে। এই কি ভাবছো?
মন্দিরা : এই, কে যেন দেখছে আমাদের, ছাড়ো আমাকে, ছাড়ো…..
সময়ের প্রেক্ষাপট অস্থির এ এক ইন্দ্রো ভালবাসার ঠানে বাঙ্গালী কন্ঠস্বর উৎগলিত। মিছিল। হরতার। অবরোধ। কালরাত্রি। চারিদিক শকুনি দৃষ্টি।
জীবন ছোটে মন্দিরার মন্দিরে। সকল শান্তিম প্রার্থনায় ভালবাসা যেন দেবীর দেবীত্ব নিয়ে বেরুল জীবন। দেবীত্ব মন্দিরার আশা পুরনে রঞ্জিতদৃষ্টি কেড়ে নিল ওথপাতা হায়নার দল। মন্দিরের দেব-দেবী নিঃস্তব্দ বাঁশির কারুসাজে।
জীবন অজ্ঞাত মাটির গন্ধ শুখে অট্টোহাসি প্রকটে।
ফেলে যেতে হয় ভালবাসার মানুষটিকে।
মন্দিরা বন্ধি হাতের কবুতর,
ডানা ঝাপটিয়ে ঝাপটিয়ে ক্লান্তি সীমানায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
উদ্দেশিত জীবন জীবনের মানে খুঁজতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ঠিকানাবিহীন কালগর্ভের ভিতর। দাউদাউ উৎপীরনের মাঝে স্বাধীন পতাকার বাতাসে মন্দিরাকে খুঁজে পেল জীর্ণ দেহে। সেই জীর্ণ দেহের তীব্র ভালবাসার দুচোখে, জীবনের কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁট তাজা ভালবাসার রক্ত মন্দিরার কপালে।
উৎস্বাশিত জীবনের মন্দিরা শুদ্ধির মায়া জালে বরণীত হলো জীবনের কাছে জীবন রেখে। মন্দিরা দিয়ে গেল প্রিয়জনের হাতে লাল সবুজের পতাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*