ময়ূরকণ্ঠী কৃষি ডেস্ক :
প্রবাল অ্যান্থজোয়া শ্রেণীভুক্ত সামুদ্রিক প্রাণী। সাগরের প্রধানতম খাদ্যের উৎস। পৃথিবীর অর্ধেক মাছই তাদের খাদ্যের জন্য প্রবালের ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ, এমনকি শুধু এশিয়ারই ১০০ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা প্রবালের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বজুড়ে প্রবাল মারা যাচ্ছে। তাই বিজ্ঞানীরা ও বিভিন্ন দেশের সরকার পৃথিবী থেকে প্রবাল উধাও হয়ে গেলে এর পরিণতি কি হতে পারে তাই ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। যদি সব প্রবাল নিঃশেষ হয়ে যায়, তাহলে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতা অত্যাসন্ন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য কনজারভেশন অব নেচার-এর কার্ল গুস্টাফ লুন্ডিন বলেন, বিভিন্ন দেশ তখন অস্তিত্বের হুমকির মুখে পড়বে।সাগরের সব প্রাণীর খাদ্যের উৎস প্রবালের সবচেয়ে নিকটাত্দীয় হলো সাগর কুসুম। এরা সাগর কুসুমের মতোই পলিপ তৈরি করে। তবে সাধারণত এরা কলোনি তৈরি করে বসবাস করে। কলোনির সব পলিপ জিনগতভাবে (জেনেটিক্যালি) অভিন্ন হয়। এরা প্রাণী হলেও পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় সাগরতলে কোনো দৃঢ় তলের ওপর গেড়ে বসে বাকি জীবন পার করে দেয় নিশ্চল হয়ে। নানা গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রবালের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। এর পেছনের মূল কারণ হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও উপকূল উন্নয়ন। এর সঙ্গে রয়েছে মাছধরা নৌকাগুলোর সমুদ্র তলদেশের তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রবালের তৈরি জুয়েলারি ও শো-পিস তৈরির প্রবণতা। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো- পৃথিবীর শতকরা ১৯ ভাগ প্রবাল ইতোমধ্যেই উধাও হয়ে গেছে।

এর মধ্যে ক্যারাবিয়ান অঞ্চলের প্রায় ৫০ ভাগ প্রবালই মারা গেছে। আরো ১৫ ভাগ প্রবাল আগামী ২০ বছরের মধ্যেই নিঃশেষ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছে ন্যাশনাল ওশিয়ানিক এন্ড এটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড কনশাস অব মেরিন স্পিশিসের ডিরেক্টর ও ওল্ড ডোমিনিওন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর কেন্ট কার্পেন্টার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বিশ্ব উষ্ণায়ন যদি অব্যাহতভাবে চলতেই থাকে, তবে আগামী ১০০ বছরে সব প্রবাল নিঃশেষ হয়ে যাবে। প্রবাল নিঃশেষ হয়ে গেলে সমুদ্রের ইকোসিস্টেম সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি আরো বলেন, এই ভারসাম্যহীনতার জন্য সব প্রাণীর জীবনে জলপ্রপাতের মতো তরঙ্গিত পতন নেমে আসবে।বিচিত্র রঙিন প্রবালগুলোকে দেখতে প্রাণহীন পাথর মনে হলেও এরা মোটেই প্রাণহীন পাথর নয়। এরা জীবন্ত, শক্ত ক্যালসিয়াম কার্বোনেট দিয়ে তৈরি। একবার তাদের মৃত্যু হলে পাথুরে দেহ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। তখন মাছ মৃত প্রবাল থেকে আর খাবার পায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ ও পানির এসিডিফিকেশন ঠেকাতে প্রবাল ঘেরা অঞ্চলকে মাছধরা ও ডাইভিংমুক্ত এলাকা ঘোষণা করা, উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন বন্ধ করা ও সেখানকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রবালের এই মৃত্যহার রোধ করা যেতে পারে। বিশ্বজুড়ে এ উদ্যোগ না নিলে গোটা সমুদ্রই প্রাণহীন হয়ে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ১৪০ বর্গমাইল এলাকা এরকম নো-টেইক জোন ঘোষণা করা হয়েছে। কতগুলো গুচ্ছ প্রবালদ্বীপের সমন্বয়ে তৈরি ড্রাই টরটাগাস ন্যাশনাল পার্কে এভাবে সীমারেখা টেনে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে এর বিরোধীদেরও অভাব নেই। অনেক মৎস্যজীবী এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে। এছাড়াও পরিবেশ রক্ষার বিভিন্ন পদক্ষেপ নানা ধরনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। সম্প্রতি কনভেনশন অন দ্য ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইন এনডেঞ্জারড স্পিশিস অব ওয়াইল্ড ফোনা এন্ড ফ্লোরাতে আমেরিকা ও সুইডেন কিছু কিছু প্রবাল প্রজাতির কেনাবেচা নিষিদ্ধকরণের প্রস্তাব পেশ করলে তা ভোটাভুটিতে নাকচ হয়ে যায়। যদি প্রবাল সব নিঃশেষ হয়ে যায় তবে প্রবালের সবচেয়ে সুলভ প্রজাতি গ্রুপার ও স্ন্যাপারও ইতিহাসে পরিণত হবে। অয়েস্টারস, ক্লামসসহ অন্যান্য নানা প্রজাতি, যেগুলো বহু লোকের খাদ্য সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিফুডসহ সমুদ্রের বাণিজ্যিক মৎস্য আহরণ বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে অবর্ণনীয়।

জাতিসংঘের মতে, সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের ওপর পৃথিবীর কমপক্ষে ৩৮ মিলিয়ন লোক নির্ভরশীল, তার সঙ্গে আরো ১৬২ মিলিয়ন মানুষ মৎস্য শিল্পের সঙ্গে জড়িত। যদি প্রবাল নিঃশেষ হয়ে যায় তবে পৃথিবীকে এর মাশুল দিতে হবে। কিছু কিছু প্রবাল ও সামুদ্রিক প্রাণীর ওপর ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিগুলো নির্ভরশীল। ক্যান্সার, আর্থ্রাইটিস ও ভাইরাসের চিকিৎসায় এগুলোর সম্ভাব্য ব্যবহার রয়েছে। প্রবাল ছাড়া বিশ্ব কল্পনা করা যায় না। তাই বিশ্বজুড়ে প্রবাল রক্ষায় সবার এগিয়ে আসা উচিত।
লেখক: রনক ইকরাম

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*