ময়ূরকণ্ঠী :

১৮৩৭ সালে আমেরিকায় প্রথম দাসপ্রথা বিরোধী নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় যার মাধ্যমে মার্কিন নারীরা রাজনীতি করার অধিকার ও সুযোগ পায়। ১৮৪৮ সালের ১৯-২০ জুলাই নারীবাদীদের উদ্যোগে নিউইয়র্কের সেনেকো ফলস এ বিশ্বের প্রথম নারীর অধিকার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৫৭ সালে নিউইয়র্কের সেলাই কারখানার নারী শ্রমিকরা এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সূচনা করে। ১৮৬০ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্ক শহরের সেলাই কারখানার নারী শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে নিজস্ব ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে সমর্থ হয়। ১৯১০ সালে জার্মান কমিউনিষ্ট নেত্রী ক্লারা জেডকিন নেত্রী কর্তৃক আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী সম্মেলনে উত্থাপিত প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯১৪ সাল থেকে প্রতিবছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

১৮৮৫ সালে মেরী কার্পেন্টারের নেতৃত্বে নারীদের মানবিক অধিকারের জন্য সংগঠন তৈরি হয় এবং আন্দোলন অব্যাহত থাকে যা নারীবাদী আন্দোলনরূপে পরিচিতি লাভ করে। ১৯০৩ সাল নাগাদ এমিলিন প্যাঙ্কখাস্টের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডে নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ইউনিয়ন গঠন এবং নারীর ভোটাধিকার আন্দোলন তীব্র হয়। ফ্রান্সে নারীবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে ৩০-এর দশকে। ১৮৪৮ সালে নিবয়েট এর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘Women Voice’ পত্রিকা। জার্মানিতে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের অগ্রণী নেত্রী ও আন্তর্জাতিক নারী দিবস ৮ মার্চের ঘোষক ক্লারা জেটকিন মার্কসবাদ বা সমাজতন্ত্রের সঙ্গে নারীবাদের সেতুবন্ধন ঘটান। ১৮৬৬ সালে দার্শনিক ও আইনজ্ঞ স্টুয়ার্ট মিল ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট সদস্য হবার পর নারীর ভোটাধিকারের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন পার্লামেন্টে। ১৮৭৯ সালে বিখ্যাত নাট্যকার হেনরি ইবসেন এর কালজয়ী নাটক ‘পুতুলের খেলাঘর’ (The Dolls House ) এর নায়িকা নোরা চরিত্রটির মাধ্যমে আধুনিক নারীবাদী চেতনা মূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। অগাস্ট বেবেল এর ‘নারী: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত’ গ্রন্থটি নারী মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম দিকদর্শনরূপে চিহ্নিত হয়েছে।

নারীবাদী পুরুষ রাজা রামমোহন রায় ১৮১৮ সালে কলিকাতায় ‘সহমরণ’ বা ‘সতীদাহ’ প্রথা বিলোপের উদ্যোগ নেন। যার ফলে ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিক সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করে আইন পাশ করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারীর শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মেরী ককের সঙ্গে মিলে মোট ৪৩টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৮৫০_৫৫ এ সময়ে বিধবা বিবাহের সপক্ষেও তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন এবং ১৮৬৭ সাল নাগাদ নিজে ৬০টি বিধবা বিবাহের আয়োজন করেন। ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ১৮৩৭ সালে কুমিলস্নায় প্রথম বালিকা বিদ্যালয় ও ১৮৯৩ সালে মহিলা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলার প্রথম নারীবাদী সংগঠন ‘সাখ সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন স্বর্ণকুমার দেবী ১৮৮৫ সালে এবং তিনি লাঠি খেলা ও অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণ-তরুণীর মধ্যে দেশপ্রেম সঞ্চারিত করার চেষ্টা করেন। ১৮৮৯ সালে বোম্বেতে অনুষ্ঠিত ভারতীয় কংগ্রেসের সম্মেলনে ৬ জন নারী যোগদান করেন। সরোজীনি নাইডু ও সরলা দেবী চৌধুরাণী প্রমূখ নারী নেত্রীরা কংগ্রেসের সভাপ্রধানের পদেও উন্নীত হন। ১৮৮৯ সালে ভারতবর্ষের প্রথম নারীবাদী আন্দোলনের সংগঠিত রূপকার মহারাষ্ট্রের পন্ডিত রমাবাঈ প্রকাশ্য আন্দোলনে নামেন।

বাংলার প্রথম নারীবাদীরূপে খ্যাত সরলা দেবী চৌধুরানী ১৯১০ সালে সর্বভারতীয় নারী সংগঠন ‘ভারত স্ত্রী মহামন্ডল’ প্রতিষ্ঠিত করেন। আর বেগম রোকেয়া আধুনিক অর্থে বাংলার প্রথম প্রকৃত নারীবাদী নারী। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে তাই রোকেয়া সাখাওয়াত, সরলা দেবী এবং পন্ডিত রমাবাঈ হলো তৎকালীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের নারীবাদী চিন্তার জনক।
১৯১৭ সালে তৎকালীন ভারতে নারীদের ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় এবং ১৯১৯ সালে এই দাবিতে নারীদের একটি প্রতিনিধিদল বৃটেনে গমন করেন। ১৮৬৯ সালে মেরী মূলার নামের এক বৃটিশ মহিলা ভোটের অধিকারের দাবিতে নারী সমাজকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়ে একটি প্রচারপত্র ছেপেছিলেন নিউজিল্যান্ডে। তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৮৯৪ সালে নিউজিল্যান্ডে মেয়েদের সীমিত ভোটাধিকার দেয়। বাস্তবে তা কার্যকরী হয় ১৯২৮ সালে। এর আগে ১৮৮২ সালে বিবাহিত মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার দেয়া হয়। এ্যামেলিন প্যাংখারষ্ট ১৯০৩ সালে ভোটাধিকারের দাবিতে বিপস্নবী নারী সংগঠন গড়ে তোলেন। বার্থা ফন সাটনার (১৮৪৩ _ ১৯১৪) ১৮৮৯ সালে ‘তোমার অস্ত্র সমর্পন করো’ নামে একটি বই লিখেন। অনেকের ধারণা এই বইয়ের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে শিল্পপতি আলফ্রেড নোবেল শানত্মি পুরস্কার প্রবর্তন করেন এবং বার্থা ফন সাটনার সে পুরস্কারটি পান। তিনিই প্রথম নোবেল বিজয়ী নারী।

পৃথিবীর ইতিহাসে নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধারা লক্ষ্য করা যায়। Marej Wollstone Craf, John Stuart, Harriet Taylor Liberal Feminism উদারনৈতিক নারীবাদ- এর প্রবক্তা। Betty Friedman মূলত রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর সমর্থক ছিলেন। বিদ্যমান সমাজ কাঠামোকে অক্ষুণ্ন রেখে পুরুষের মত নারীরও সমান অধিকার অর্জনের জন্য সংগ্রাম করাটা হলো এর মূল বৈশিষ্ট্য। এরা মূলত সংস্কারে বিশ্বাসী। তাদের আশা বিদ্যমান সামাজিক প্রতিষ্ঠান, আইন-কানুন বিধি ব্যবস্থা সংস্কার সংশোধন করে নারী ও পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য ও অসমতা দূর করা সম্ভব। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস মার্কসবাদী মতাদর্শ হলো মার্কসীয় নারীবাদের ভিত্তি, লেনিন, অগাস্ট বেবেল, ক্লারা জেটকিন, আলেকজান্ডার কোলনতাই প্রমূখ এই মার্কসীয় নারীবাদের ভিত্তি নির্মান করেছে। এরা শ্রেণী বৈষম্যকে নারী নির্যাতনের কারণ বলে চিহ্নিত করেন। Capitalism উচ্ছেদ করে শ্রেণীহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে নারী মুক্তি সম্ভব বলে এরা মনে করেন। এদের কাছে নারীমুক্তি আন্দোলন পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, পুজিবাদী ব্যবস্থা এবং পুরুষতান্ত্রিক পুজিবাদী সামাজিক সম্পর্কের বিরূদ্ধে। বিংশ শতাব্দীর ৬০-এর দশকে আমূল নারীবাদী ধারার উদ্ভব ঘটে পাশ্চাত্যে। Shula mittle Fierstone এই ধারার জনক। Kate Millet , Marilyn French এ মতবাদের প্রবক্তা। এই নারীবাদের মূল কথা হলো, পুরুষ নারীকে শোষণ করে Sexual oppressionএর মাধ্যমে। এরা নারী ও পুরুষের বিচ্ছেদে বিশ্বাসী। পিতৃতন্ত্রের বিলুপ্তি এবং পুরুষের সঙ্গে নারীর সম্পর্ক অস্বীকার করে নারীর স্বাতন্ত্র্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিদার। এখানে পুরুষকে প্রতিপক্ষরুপে চিহ্নিত করে প্রচলিত বৈবাহিক সম্পর্ককে অস্বীকার করা হয়। তারা উন্নত প্রযুক্তি দ্বারা কৃত্রিম উপায়ে মাতৃগর্ভের বাইরের সন্তান জন্মদানের পক্ষে যাতে করে রাষ্ট্র এবং পুরুষদেরও মানব প্রজাতিকে বাঁচিয়ে রাখার দায় সমানভাবে বহন করতে হয়। নারীকে যৌন সামগ্রী হিসেবে পুরুষ ‘যৌন রাজনীতি’ মাধ্যমে যে শোষণ চালায় তার আমূল বিলোপ সাধনই নারী মুক্তির মূলকথা। এরা সমকামে বিশ্বাসী এবং মাতৃতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন লালন করে যা বর্তমান পরিবারের বিলুপ্তি ঘটাবে। তারা বিশ্বাস করে, পিতৃতন্ত্র ও তার অনুসারী সমাজ ব্যবস্থা সমূলে উৎপাটিত করে নারী ও পুরুষের সমতা আনা সম্ভব। এই ধারাকে অনেকে উগ্র নারীবাদ বলে চিহ্নিত করে থাকে।

রেডিক্যাল এবং মার্কসীয় নারীবাদের এক ধরনের মিলিত রূপ হলো সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ। এরা মনে করে যে, ধনতন্ত্র ও পিতৃতন্ত্রের জটিল মিথস্ক্রিয়া নারীর প্রতি বৈষম্যের কারণ এবং ধনতন্ত্র ও পিতৃতন্ত্র উভয়ের বিলোপ সাধন না করে নারী মুক্তি সম্ভব নয়। এরা বিশ্বাস করে যে, নারীর প্রকৃত স্বাধীনতাই সমাজের সমতা অর্জন নিশ্চিত করতে পারে। এই নারীবাদকে অনেকে Social Feminism রূপেও অভিহিত করে থাকে। কিছুটা Radical Feminism এবং কিছুটা Socialist Feminism এর মিলিতরূপ এই Cultural Feminism মনে করে যে, জেন্ডার সম্পর্ক সামাজিক ও ঐতিহাসিকভাবে সৃষ্ট এবং তা পরিবর্তনযোগ্য। নারী-পুরুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্যজনিত বাস্তবতা নয়, মনসত্মাত্তিক গড়নই নারীর অধিনসত্মতার কারণ। এই নারীবাদ কখনো মাতৃত্বকে অবমুল্যায়ন এবং নারী সুলভ গুণাবলীকে ধ্বংস করার পক্ষপাতি নয়। অবশ্য এরাও পুরুষকে তাদের শত্রুরূপে বিবেচনা করে। নারী ও প্রকৃতির উপর সমান্তরালভাবে বিদ্যমান পুরুষ প্রাধান্যের অবসান দাবি করে পরিবেশ নারীবাদ। ভারতের বন্দনা শিবা, মারিয়ামিজ প্রমূখ এই পরিবেশ নারীবাদের অন্যতম প্রবক্তা। পরিবেশ নারীবাদ নারী এবং পরিবেশকে অভিন্ন মাত্রায় সংযোজন করে। এর মল বক্তব্য হলো নারী ও প্রকৃতি উভই পিতৃতন্ত্রের নির্মম শিকার। বৈশ্বিক নারীবাদ নারীদের অবস্থানকে বৈশ্বিকভাবে দেখার একটি দিক-নির্দেশনা প্রদান করে। তারা মনে করে লিঙ্গ বৈষম্যহীন সমাজ নির্মানের কর্মকৌশল এমন একটি বৈশিষ্ট্যকে সাপোর্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে যেখানে প্রতিটি সমাজের নারীরা তাদের সমস্যাবলীকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করা ও সমাধানের উপায় খুঁজে বের করাই এ মতবাদের মূল বক্তব্য।

উপমহাদেশে পারিবারিক নির্যাতনের ইতিহাস বিশেস্নষণ করলে দেখা যাবে, পারিবারিক কাঠামোতে প্রতি পদে পদে পুরূষতন্ত্র নারীর পায়ে নির্যাতনের বেড়ি পরিয়েছে কখনো ধমের নামে, কখনো সমাজের নামে, কখনো বেহেশত বা স্বর্গের লোভ দেখিয়ে, কখনো সামাজিক সুনামের লোভ দেখিয়ে। এছাড়াও কতক জঘন্য সামাজিক কুসংস্কার এ দেশের নারী সমাজকে পদদলিত করেছিল। যেমন সতীদাহপ্রথা, বিধবা বিবাহ ইত্যাদি। যার ফলস্বরূপ এ দেশে বিভিন্ন ধরণের নারীবাদ এবং নারীবাদীর জন্ম হয়। পূর্বে যে সকল নারীবাদী দেখা যায় তারা হলেন রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বেগম রোকেয়া ইত্যাদি । মাঝেমধ্যে আমূল নারীবাদ ও দেখা যায়। এদের মধ্যে বিখ্যাত হলেন তসলিমা নাসরিন। বাংলাদেশে নারীবাদ বিষয়ে যারা ইতিমধ্যে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন- সারা হোয়াইট, ক্রিস্টার্ন ওয়েস্টগার্ড ও ভ্যানশেন্ডেল, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, নায়লা কবির, রওনক জাহান, মাহমুদা ইসলাম, নাজমা চৌধুরী, খালেদা সালাহ উদ্দীন, মেঘনা গুহ ঠাকুরতা , আনু মুহম্মদ প্রমুখ। এদেশের মানুষ ধর্মভিরু এবং স্থানীয় সাংস্কৃতির প্রতি বেশী অনুরাগ থাকায় আমূল নারীবাদীরা তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। কিন্তু উদারনৈতিক নারীবাদীরা সমাদৃত হয়েছেন বা হচ্ছেন।

সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে নারীবাদের বহুল আলোচিত প্রপঞ্চটি হচ্ছে “নারীর ক্ষমতায়ন”। নারীর ক্ষমতায়নকে এখন সামাজিক উন্নয়নের সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেবলমাত্র মানবেতর অবস্থা থেকে নারীর মুক্তি বা নারী উন্নয়নের জন্যই নয়, পৃথিবী মুখোমুখি এমন সকল সমস্যার সমাধানে প্রধান ও প্রথম ধাপ হিসাবে নারীর ক্ষমতায়নকে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। ক্ষমতায়ন ক্ষমতায়ন একটি জটিল ও বহুমুখি প্রত্যয়। ক্ষমতায়ন প্রত্যয়টির সাথে ক্ষমতার ধারণাটি জড়িত। বস্তুগত, মানবিক ও বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রনকে ক্ষমতা বলে। এধারণকে চারভাগে ভাগ করা যায়। সম্পদ: ১)ভৌত(জমি, পানি, বল) ২)মানবিক(মানুষ, তাদের শারিরীক শ্রম ও দক্ষতা) ৩) অর্থনৈতিক(অর্থ, অর্থে অভিগম্যতা ) ৪) বুদ্ধিভিত্তিক (জ্ঞান, তথ্য, ধারণা) ক্ষমতায়ন শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন Paulo Faire (1973) আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ক্ষমতায়ন শব্দটি একটি জনপ্রিয় পরিভাষা হয়ে উঠে এবং তা Welfare, Development, Participation , Control, Access ইত্যাদি শব্দগুলোর স্থলাভিষিক্ত হয়(longwe,1990:204)। ক্ষমতায়ন হচ্ছে নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার একটি প্রক্রিয়া। Material resources, Intellectual resource ও আদর্শগত ধারণার উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে ক্ষমতায়ন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। ক্ষমতায়ন সম্পর্কে Chandra বলেন “Empowerment in the simplest form means the manifestation of redistribution of power that challenges patriarchal ideology and the male dominance” ( Chandra 1997 ). ক্ষমতায়ন সম্পর্কে Pillai বলেন Empowerment is an active, multidimensional process which enables woman to realize their full identity and power in all spheres of life. Power is not a commodity to be transacted; nor can it be given by away as aims. Power has to be acquired and it needs to be exercised, sustained and preserved (Pillai, 1995).

ক্ষমতায়ন যার উপর নির্ভর করে- i) Ability to participate in decision making ii) Control over economic resources and iii) Change and equal opportunity। ক্ষমতায়নের স্বরূপ অনেক রকমের হতে পারে। যেমন: সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক। তবে ক্ষমতায়ন শব্দটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে মেয়েদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের বিষয়কে ঘিরে (নুরুল আলম, ১৯৯৯:৭৬) ক্ষমতায়ন ধারণাটি কাঠামোগত ও বিদ্যমান সমাজের কতগুলো সম্পর্ক দ্বারা নির্ধারিত হয়। ক্ষমতায়ন সম্পর্কে ড. শওকত বলেন, ‘রাষ্ট্র এবং সমাজের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় কর্মপদ্ধতি এবং কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রহণে এবং বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকে ক্ষমতায়ন বলা হয়’। মাহমুদা ইসলাম তার নারীবাদী চিন্তা ও নারী জীবন গ্রন্থে বলেন ‘ক্ষমতায়ন এমন একটি প্রক্রিয়া যার দ্বারা নারী কল্যাণে সমতা এবং সম্পদ আহরণে সমান সুযোগ অর্জনের লক্ষ্য সামনে নিয়ে জেন্ডার বৈষম্য অনুধাবন নিশ্চিত করণ ও বিলোপ সাধনের জন্য একজোট হয়। Rowland ক্ষমতায়নকে ত্রিমাত্রিক বলে মনে করেন। তার মতে এটা হলো ব্যক্তিগত, সম্পর্কগত এবং সমষ্টিগত, ব্যক্তিগত দিক হচ্ছে,‘a sense of self and individual confidence and capacity and undoing the defects of internalized opposition. সম্পর্কগত দিক হচ্ছে Developing the ability to negotiate and influence the nature of a relationship and decisions made within it.সমষ্টিগত দিক বলতে বুঝায়, where individual work together to achieve a more extensive impact than each could have had alone. This includes involvement in political structures but might also cover collective action based on co-operation rather than competition, Collective action may be locally focused for example, groups acting at village or neighborhood level or be more institutionalized such formal procedures of the United Nations.

ক্ষমতায়নকে একটি প্রক্রিয়া এবং প্রক্রিয়ার ফলাফল হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে যেখানে সমাজের ক্ষমতাহীনরা বা কম ক্ষমতাবানরা বস্তুগত এবং মানবিক সম্পদের উপর অধিকতর নিয়ন্ত্রন অর্জন করে এবং বৈষম্য ও অধ:সত্মনতার মতাদর্শ যা এই অসম বন্টনকে গ্রহণীয় করে তাকে চ্যালেঞ্জ করে। দক্ষিণ এশিয়াতে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলকভাবে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। যথা: Integrated Development, Economic Development and Awareness raising (Sushama, 1998:50) সমন্বিত উন্নয়ন তত্ত্বের মূল দর্শন হলো, পরিবার ও সামাজিক সমাজের উন্নয়নের চাবিকাঠি হলো নারী উন্নয়ন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো, যে বিষয়গুলো নারীর অধসত্মনতা সৃষ্টি করে সে বিষয়গুলো সম্পর্কে তাদের সচেতন করে তুলতে হবে। DAWN ( Development Alternative with Woman for New era) নারীর ক্ষমতায়নের সংজ্ঞা ব্যখ্যা করতে গিয়ে বলেছে এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে জেন্ডার বৈষম্য বিহীন এক পৃথিবী গড়ে তোলা। যে পৃথিবীতে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারী তার নিজের জীবনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম। নারীর ক্ষমতায়নের মূল লক্ষ হচ্ছে ক্ষমতার উৎস ও কাঠামোর পরিবর্তন। নাজমা চৌধুরী ‘নারীর ক্ষমতায়ন : রাজনীতি ও নারী” শীর্ষক প্রবন্ধে যে লক্ষ্যগুলির বর্ণনা করেন তাহলো- নারীর সুপ্ত প্রতিভা এবং সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশের সুযোগ, নারীর জীবনের ওপর প্রভাব বিসত্মারকারী সিদ্ধান্ত সমূহে অংশগ্রহণের সুযোগ নিজের জীবন সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিমন্ডল, পরিধি ও সম্ভাবনার বিসত্মার।

জেন্ডার ক্ষমতায়ন সূচকে বাংলাদেশের স্থান ১০৪ টি দেশের মধ্যে ৭৭ তম। এদেশে পারিবারিক নির্যাতনও মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করছে। একটি জরিপে গ্রামের সবচেয়ে প্রকট সমস্যাগুলো চিহৃিত করতে গিয়ে মাত্র ৩% পুরুষ গ্রামবাসী নারী নির্যাতনের কথা উলেস্নখ করেছেন।বাকি ৯৭% পুরুষ এলাকার বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে নারী নির্যাতনকে সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছে। নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য প্রসঙ্গে ৩০% উত্তরদাতা পুরুষ কোন মন্তব্য করেননি ।জরিপে উত্তরদাতা পুরুষের ৫৩.৬% নারীর অধিকারের পক্ষে তাদের মত ব্যক্ত করেছে । আর ৬০% পুরুষ উত্তরদাতা মন্তব্য করেছে যে নারীদের অধিকার সম্পর্কে কিছু জানানোর দরকার নেই । জাতিসংঘ জনসংখ্য তহবিলের পরিচালিত এই জরিপে ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন গ্রামের ৫০২ টি পরিবারের পুরুষ সদস্যরা অংশ নিয়েছিল ।এই পুরুষ সদস্যরা নারীর অধিকার নিয়ে যা ভাবে তা হচ্ছে, ৬৫% পুরুষ ধমর্ীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে স্ত্রীকে মারধর করা সমর্থন করে। ৫১%পুরুষ মনে করে সমাজে নারীর অবাধে চলাফেরা উচিৎ নয়। ৬০% পুরুষ মনে করে নারীর চলাফেরা পুরুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিৎ । ৭০% পুরুষ মনে করে মেয়েদের অবশ্যই পর্দা করা উচিৎ। ৯৭% নারী নির্যাতনকে তার এলাকা বা সমাজের একটি সমস্যা বলে মনে করে না ৬০%পুরুষ মনে করে স্বামীর কথা মত স্ত্রীর চলা উচিত। ৯৭ % নারীর ধারণ মাতৃত্ব নারীর একটি প্রধান চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য। ৬০% উত্তরদাতা পুরুষ মনে করে স্বামী পরিত্যক্তা নারীর কাছ থেকে কোন রকম অর্থনৈতিক সুবিধা বা সাহায্য পাওয়া উচিত নয়।

ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে ১৯৯৬ সালে ৮০ টি,১৯৯৭ সালে ১১৭ টি, ১৯৯৮ সালে ১৩০ টি এবং ১৯৯৯ সালে ১৬৮ টি। সার ভাইভরস ফাউন্ডেশন (এস.এস.এফ) থেকে প্রাপ্ত হিসেব অনুযায়ী ২০০০ সালে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে ২২৬ টি, আর ২০০১ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত এসিড দগ্ধ হয়েছেন ২৭১ জন। এসিড দগ্ধ নারীর মধ্যে বেশীর ভাগই কিশোরী। দি ইনষ্টিটিউট অব ডেমোক্রেটিক রাইটস এর হিসাব অনুযায়ী ২০০০ সালের মার্চ মাসেই এসিড দগ্ধ হয়ে মারা গেছে ২০জন। নারী সহিংসতা ও নারী নির্যাতন বৃদ্ধির হার আশংকাজনক। সমাজে নারীর প্রতি গড়ে উঠা দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ গুলোও সুস্পষ্ট। তাই বিদ্যমান সংকট নিরসনে যৌক্তিক বিবেচনা করেই উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সমাজের প্রচলিত বিশ্বাস মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, ঐতিহ্যকে বিবেচনায় না এনে কোন প্রক্রিয়াতেই নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। সংস্কার বা পরিবর্তন হঠাৎ করে জোর করে চাপিয়ে দেয়ার বিষয় নয়। আধিপত্যশীল সংস্কৃতির বিদ্যমান অবস্থার সাথে সংঘর্ষ বাধিয়ে নতুন করে সমস্যা বাড়াবে। তাই ধীরে ধীরৈ কৌশলে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে। যাতে কারো প্রতি সুবিচার করতে যেয়ে কারও প্রতি অবিচার না হয়ে পড়ে। নিজস্ব স্বকীয়তা, সংস্কৃতি আত্মপরিচয় হুমকির মুখে না পড়ে। গভীরে প্রোথিত শিকড়ে টান না লাগে, মানসিকভাবে নতুন করে ভাবতে, চিন্তা করতে, মন-মানসকে প্রস্তুত করতে হবে। এজন্য মানসিক পরিবর্তন ও চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন হবে। যা হঠাৎ হয়ে যাবে না। সরকারী বেসরকারী কর্মকান্ডের মাধ্যমে ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক মানবিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে বৃহত্তর জনমানসের বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সাথে সমন্বয় করে এগিয়ে যেতে হবে।

নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে চিন্তাশীল মানুষকে আরও সজাগ হতে হবে। র্সবস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। নারী সমাজের জীবনের বাস্তব দিকগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা এবং তার অবস্থান কোথায় বা কোথায় থাকা উচিত তা উপলব্ধি করতে পারাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বায়নের যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতির পরও আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন না হওয়াটা দু:খজনক। নারীদের নিরাপত্তা কোথাও নেই । কারণ নারীরা একা একা চলতে সাহস পায় না। সন্ধ্যার পর একজন নারীকে বাইরে বের হতে হলে তাকে ঘরে ফেরা পর্যন্ত সন্ত্রস্ত্র থাকতে হয়। আমাদের সমাজে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহিংসতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়না । যে সহিংস আচরণ করছে তাকে দোষী না করে বরং যার প্রতি সহিংসতা করা হলো তাকেই দোষী সাব্যস্থ করা হয়। সহিংসতা সম্বন্ধে সমাজে সচেতনতার এই অভাব পূরণে সম্মিলিত প্রয়াস চালাতে হবে। নারীর প্রতি সহিংস আচরণ সমাজে বৃদ্ধি পাচ্ছে রাজনৈতিক সহিংসতা ছাড়াও সামাজিক সহিংসতা যথেষ্ঠ পরিমাণে বেড়েছে যা মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলছে। মানব সমাজ জ্ঞান ও প্রযুক্তির দিক দিয়ে যতটা সভ্যই হোক না কেন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কোনো কেনো ক্ষেত্রে প্রত্যাশার তুলনায় নিতান্তই সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। নারীর সহিংসতা, নির্যাতন, নিপীড়ন, বঞ্চনা বৈষম্য এগুলো মোটেই কাম্য নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*