ময়ূরকণ্ঠী ডেস্ক :
‘শিশু’ কথাটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোমলমতি সুন্দর নিষ্পাপ চেহারা। কিন্তু অনেকেই সেটা ভুলে তাদের নির্যাতন করে থাকে। বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত শিশু হত্যাকাণ্ডের কথা জেনে আমরা সবাই স্তম্ভিত ও শোকাহত হয়ে পড়ি। এসব ঘটনার ফলে শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে বারবার প্রশ্ন ওঠে। অথচ শিশুদের সুরক্ষা দিতে দেশে ৩৫টি আইন রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নেই। আইনের সঠিক প্রয়োগ বা ব্যবহার না হওয়ার কারণে দেশে শিশু নির্যাতন ও মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। প্রতিনিয়তই শিশুর ওপর সহিংসতা, যৌন নিপীড়নসহ আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। শিশুশ্রম, বিবাহ, পতিতাবৃত্তি, পর্নোগ্রাফি, গৃহশ্রম, যৌন নির্যাতন, পাচার, পথশিশু ভিক্ষাবৃত্তি, বাধ্যতামূলক ভিক্ষাবৃত্তি, প্রতিবন্ধী, রাজনীতিতে শিশুদের ব্যবহার ইত্যাদি ১২টি ক্যাটাগরিতে শিশু আইন সবসময় লঙ্ঘন করা হচ্ছে। মহানবী সা: ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা শিশু সন্তানদের স্নেহ করো, তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করো এবং সদাচরণ ও শিষ্টাচার শিক্ষা দাও’ (তিরমিজি)। শিশুদের প্রতি দয়ামায়া প্রদর্শন সম্পর্কে নবী করীম সা: বলেছেন, ‘যে শিশুদের প্রতি দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না’ (বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি)।

শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে তিন বছরে বাংলাদেশে ৯৬৮টি শিশুকে নির্যাতন করা হয়েছে। সর্বাধিক উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, ২০১৪ সালে শিশুহত্যার হার আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৬১ শতাংশ বেশি। এ বছর হত্যার পাশাপাশি নৃশংসতাও বেড়েছে। বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে ২৬৭টি সংগঠনের মোর্চা, শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১২ সালে ২০৯টি, ২০১৩ সালে ২১৮টি, ২০১৪ সালে ৩৫০ শিশুকে হত্যা করা হয়। চলতি বছরে সাত মাসেই সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ১৯১ জনে।

মানবাধিকার সংগঠন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ৬৯ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে গত জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত ১৩ জনকে নৃশংস কায়দায় হত্যা করা হয়েছে। ২০১২ সালে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ১২৬টি, ২০১৩ সালে ১২৮টি, ২০১৪ সালে ১২৭টি। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্য মতে, ২০১২ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় ২০৯ জন শিশু। এ সময় হত্যার চেষ্টা করা হয় কয়েকজনকে। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে ১৯১ জন শিশুকে। এ সময় হত্যার চেষ্টা করা হয় আরো পাঁচ শিশুকে। ২০১৩ সালে হত্যা করা হয় ২১৮ জন শিশুকে। হত্যার চেষ্টা করা হয় ১৮ শিশুকে। ২০১৪ সালে দেশে ৩৫০ জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এ সময় আরো ১৩ শিশুকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে ১৯১ জন শিশুকে। এ সময় হত্যার চেষ্টা করা হয় আরো ১১ শিশুকে।

শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের চেয়ে ২০১৪ সালে এসব ঘটনা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ২০১৪ সালে আগের বছরের চেয়ে শিশুমৃত্যু বেড়েছে ৭৭ শতাংশ। শিশু নির্যাতন বেড়েছে ১৪ শতাংশ। আর যৌন নিপীড়ন বেড়েছে ৯ শতাংশ। চলতি বছরে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিশুর ওপর সহিংসতার ঘটনা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। ২০১৩ সালে এসব ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ৩১৩টি, ২০১৪ সালে ঘটেছে দুই হাজার ১৯৭টি এবং ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঘটেছে চার হাজার ৬৭৭টি। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৪০৪টি। ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে ৫০টি। শিশু হত্যাকাণ্ড হয়েছে ২৪৬টি। ২২ জন শিশুকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশুদের মধ্যে ২১ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩১ জনকে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে সারা দেশে ৩৬৬ শিশু নানাভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।

শিশু ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, শিশুর মা-বাবার ওপর প্রতিশোধ, মুক্তিপণ, যৌন নিপীড়ন, জমিসংক্রান্ত বিরোধ ছাড়াও সামান্য কারণেও ঘটছে শিশুমৃত্যু বা হত্যা। ২০১৪ সালে মেয়ে শিশুকে ধর্ষণ বা এর চেষ্টা, ধর্ষণের পর হত্যা, ধর্ষিত হওয়ার পর আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে মারাত্মকভাবে। শিশু অপহরণও বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। অন্তত ২২০ জন শিশুকে অপহরণ বা অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের সংখ্যাও বেড়েছে। এ ছাড়া ২০১৪ সালে গৃহকর্মী নির্যাতন, শিশু পাচার এবং নবজাতক চুরির ঘটনাও বেড়েছে।

শিশু ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে শিশুর ওপর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৯৮৯টি, অপহরণ ও হারানোর ঘটনা ঘটেছে ৪১৯টি। যৌন নিপীড়নের ঘটনা ২২১টি, নির্যাতনের ঘটনা ২৬৭টি এবং আহত করার ঘটনা ঘটেছে ৩০১টি। সব মিলিয়ে মোট দুই হাজার ১৯৭টি এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৩ সালে ঘটেছিল এক হাজার ৩১৩টি। শিশুর ওপর সহিংসতার ঘটনার মধ্যে ৫১ শতাংশ ক্ষেত্রে ছেলে শিশু এর শিকার হয়েছে।

‘স্টেট অব চাইল্ডরাইটস্ ইন বাংলাদেশ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার হওয়া শিশুর সংখ্যা ছিল ৬২ জন। চলতি ২০১৫ সালের প্রথম ছয় মাসে তা তিন গুণেরও বেশি হয়ে ২৩০-এ দাঁড়িয়েছে। গত ২০১৪ সালের প্রথম ছয় মাসে আত্মহত্যা করেছিল ৫৫ জন শিশু। ২০১৫ সালে উল্লিখিত সময়ে আত্মহত্যা করেছে এর দ্বিগুণের বেশি, ১২৬ জন। গত বছর একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুর সংখ্যা ছিল ১৩৬ জন। ২০১৫ সালের প্রথম ছয় মাসে নিহত হয়েছে ২৮১ জন।
আইনের গতানুগতিক ফাঁক, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং বিচারহীনতার কারণে অনেক সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। ফলে তাদের সাহস ক্রমেই বেড়ে চলে। শিশু নির্যাতন রোধকল্পে এবং আর যাতে কেউ এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির সাহস না পায়, সেজন্য শিশু নির্যাতনকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া জরুরি। তা না হলে শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই যাবে। শিশু নির্যাতন বন্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। তবেই এ জাতীয় অপরাধপ্রবণতা কমবে, অন্যরাও সাবধান হবে।

সিলেট ও খুলনায় চলতি বছর মার্চ, জুলাই ও আগস্টে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার তিন শিশু- শেখ সামিউল আলম রাজন, রাকিব হাওলাদার এবং সাঈদের মামলার কার্যক্রম নিম্ন আদালতে যে দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হয়েছে, তা দেশে ন্যায়বিচারের পথে এবং বিচার বিভাগের ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিচার বিভাগের জন্য এ রায়গুলো মাইলফলক।

হত্যাকাণ্ডের তিন থেকে চার মাসের মাথায় এবং যথাক্রমে ১৭, ১১ ও ৯ কার্যদিবসে মামলার কার্যক্রম সম্পন্ন করার নজির এ দেশে এর আগে জানা মতে আর নেই। রাকিব হত্যায় দু’জনের মৃত্যুদণ্ড, রাজন হত্যায় অভিযুক্ত ১৩ জনের মধ্যে চারজনের মৃত্যুদণ্ড ও অন্য ছয়জনের যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড, সাঈদ হত্যায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড সবার প্রত্যাশিতই ছিল।

তিন মামলার রায়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, অপরাধীরা এই অনুকম্পা পায়নি। দেশের মানুষ মনে করে যে, এই রায়ের মধ্য দিয়ে আইনের শাসন কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অপরাধীদের শাস্তি যত দ্রুত কার্যকর হবে, সমাজে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা তত সহজ হবে। প্রবীণ আইনজীবীদের মতে, দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে শিশু রাজন, রাকিব এবং সাঈদ হত্যা মামলা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এ ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে এ ধরনের অপরাধ থামানো যাবে না।

শিশুর ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে শিশু আইনের প্রয়োগ, শিশু পর্নোগ্রাফি, পাচার ও শিশু বিবাহ রোধে প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে। আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে অস্বাভাবিক শিশুমৃত্যুর হার রোধ করা সম্ভব। শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় যত আইন আছে সেগুলো যদি প্রয়োগ করা যায়, অবশ্যই ইতিবাচক সুফল পাওয়া যাবে। আলোকিত ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিশুদের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। গাইবান্ধার শিশু তৃষা আত্মহননের পথ বেছে নেয়ার পর দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। নারী আন্দোলনের কর্মীরা বিষয়টি নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।
কন্যা শিশুদের নিরাপদে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এই শিশুর প্রতি বৈষম্য ঘোচাতে হবে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য তাদের এগিয়ে নিতে হবে। তাদের সুশিক্ষার পাশাপাশি যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ছেলে শিশুরাও আজ চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। শিশু নির্যাতনকারীদের শনাক্ত, প্রতিরোধ ও বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে অব্যাহতভাবে সোচ্চার থাকতে হবে। নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি তাদের সুরক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সর্বস্তরের জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। শিশুরা যেভাবে বেড়ে ওঠা প্রত্যাশিত, সেভাবেই বিকাশের পথ করে দিতে হবে। তাদের আত্মপ্রত্যয়ী ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে হবে। আসুন, আমরা সবাই মিলে শিশুবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*